জাহিদ হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার, চাঁদপুর
চাঁদপুর শহরের পুরানবাজারে অবস্থিত কোহিনুর সিনেমা হল—একসময় যা ছিল বিনোদন, আনন্দ, বন্ধুত্ব আর পারিবারিক ভালোবাসার এক পরিচিত ঠিকানা। আজ সেই সিনেমা হলকে ঘিরে পড়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি। হলটি হয়তো আগের মতো নেই, নেই সেই চেনা পরিবেশ; কিন্তু স্মৃতির পাতায় আজও অমলিন হয়ে আছে সোনালি দিনের গল্পগুলো।
কোহিনুর সিনেমা হলের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল একটু অন্য রকম। এই হলের ম্যানেজার ছিলেন আমার বড় মামা। মামা আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁকে ঘিরে থাকা স্মৃতিগুলো আজও হৃদয়ের গভীরে গেঁথে আছে। ছোটবেলায় আনু নামের একজনের কাছে মামার নাম বলেই হলে ঢুকে সিনেমা দেখতাম। কখনো মহিলা কেবিনেও মামার পরিচয় দিয়ে ছবি দেখার সুযোগ হয়েছে। ‘বিয়ের ফুল’ সিনেমাটি বিনা পয়সায় দশবার দেখার স্মৃতি আজও আমাকে নস্টালজিক করে তোলে।
কোহিনুর সিনেমা হলে দেখেছি ‘লাল বাদশা’, ‘নারীর মন’, ‘বাঘের থাবা’সহ অসংখ্য সিনেমা। আমার প্রিয় নায়ক ছিলেন মান্না। তাঁর সিনেমা দেখার উন্মাদনা ছিল অন্য রকম। বন্ধু অলুর সঙ্গে মান্নার ছবি দেখতে গিয়ে কত মজার ঘটনা ঘটেছে! কখনো বন্ধুর দুষ্টুমিতে, কখনো সিনেমার নায়কের মারপিট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকায় ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে অভিনয়ের ছলে মারামারিও করতাম। পরে অলুর চাচাতো ভাই হাবিবও আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এই তিন বন্ধুর সিনেমা দেখার দিনগুলো আজও মনের পর্দায় জীবন্ত।
শুধু কোহিনুর নয়, চাঁদপুরের নতুন বাজারের ছায়াবাণী ও চিত্রলেখা সিনেমা হল, মতলবের কাজলী ও রাজমহল সিনেমা হল—এসব স্থানেও জমে আছে জীবনের অসংখ্য স্মৃতি। ২০০৬ সাল থেকে সিনেমা দেখার সেই দিনগুলোর কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। বিশেষ করে চাঁদপুরের মিশন রোডের ছায়াবাণী সিনেমা হল ছিল আমার কাছে অন্যতম প্রিয়। সিনেমা দেখতে গিয়ে বড় ভাই কিংবা চাচাদের হাতে বকা ও মার খাওয়ার ঘটনাও ছিল সেই সময়ের জীবনের অংশ। আজ সেসব স্মৃতি মনে পড়লে কষ্টের মাঝেও মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
সিনেমা দেখা তখন শুধু বিনোদন ছিল না; এটি ছিল বন্ধুত্বের বন্ধন, পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি এবং সামাজিক মেলবন্ধনের একটি মাধ্যম। একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়া, প্রিয় নায়কের অভিনয় নিয়ে আলোচনা, পর্দার গল্প নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—সব মিলিয়ে তৈরি হতো এক অন্য রকম আনন্দের জগৎ। চাঁদপুর ও মতলবের বিভিন্ন সিনেমা হলে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আজও আমাদের সম্পর্কের স্মারক হয়ে আছে।
সময়ের পরিবর্তনে সেই সংস্কৃতি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় সিনেমা হল ছিল মানুষের অবসর কাটানোর অন্যতম প্রধান স্থান। পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়ার মধ্যে ছিল আনন্দ, আন্তরিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতি। অথচ আজ সেই পরিচিত পরিবেশ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সিনেমা হলের জায়গা দখল করেছে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিনোদন। পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে এক প্রজন্মের আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সিনেমা হলের সেই দিনগুলোতে মানুষের মধ্যে যে আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও সামাজিক যোগাযোগ ছিল, তা আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। অবশ্যই সময়ের সঙ্গে সংস্কৃতির পরিবর্তন স্বাভাবিক, তবে সুস্থ বিনোদন ও পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা ধরে রাখা জরুরি। কারণ, সংস্কৃতি শুধু আনন্দ দেয় না, মানুষকে মানুষের কাছেও টেনে আনে।
কোহিনুর, ছায়াবাণী, চিত্রলেখা, কাজলী কিংবা রাজমহল—এসব নাম শুধু সিনেমা হলের নাম নয়; এগুলো আমাদের শৈশব, কৈশোর, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের একেকটি অধ্যায়।
আজ হয়তো সেই হলগুলোর আলো আগের মতো জ্বলে না, বড় পর্দায় ভেসে ওঠে না প্রিয় নায়ক মান্নার ছবি। কিন্তু হৃদয়ের পর্দায় সেই দৃশ্যগুলো আজও জীবন্ত। বড় মামার স্মৃতি, বন্ধু অলু ও হাবিবের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন মুহূর্ত এবং সিনেমা দেখতে গিয়ে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট ঘটনাগুলো কোনো দিন ভোলার নয়।
সিনেমা হল হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সিনেমা হলকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভালোবাসা, বন্ধুত্ব আর স্মৃতিগুলো কখনো হারিয়ে যায় না। চাঁদপুরের হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলো তাই শুধু অতীতের স্থাপনা নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক আবেগময় অধ্যায়।