লামা-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে অবৈধ বালুর উত্তোলন ও পাচারের হিড়িক: ড্রেজার-স্যালুমেশিনের থাবায় ধ্বংসের মুখে পরিবেশ

লামা, বান্দরবান প্রতিনিধি:

বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তর টিনের চশমা দিয়ে ঘুমাচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন অবৈধ উত্তোলনকৃত বালু নিলাম দিয়ে বৈধ করতে ব্যস্ত।

​বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বালুখেকো চক্রের বেপরোয়া তাণ্ডবে জনজীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। পাহাড় ও ছড়াবেষ্টিত এই অঞ্চলের নদী-নালারা এখন আর স্বাভাবিক প্রবাহে নেই ড্রেজার ও সেলো মেশিনের বিকট শব্দ আর মাটির অতল থেকে বালু চুষে নেওয়ার তাণ্ডবে চারপাশ বিরান ভূমিতে পরিণত হচ্ছে।

বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তর টিনের চশমা দিয়ে ঘুমাচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন অবৈধ উত্তোলনকৃত বালু নিলাম দিয়ে, বৈধ করতে ব্যস্ত। মাঝখানে বিরান ভূমিতে রূপ নিচ্ছে লামা দুই শতাধিক বালু পয়েন্ট। ফসলের জমি, রাস্তাঘাট, নদীর পাড়, অবকাঠামো, ব্রিজ কালভার্ট ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ ও জনগণ দেখার যেন কেউ নেই। প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের উদাসীনতার সুযোগে স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট লাইল্যারমার পাড়া স্কুলের মতো স্পর্শকাতর এলাকার দু’পাশে একাধিক শ্যালু মেশিন বসিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে।

সরেজমিনে ​গিয়ে স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে জানা যায়, লাইল্যারমার পাড়া স্কুলের দুই পাশের খুটাখালী ছড়া থেকে ৯টির মতো শক্তিশালী সেলো ও ড্রেজার মেশিন বসানো হয়েছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ছড়ার তলদেশ চুষে নেওয়া হচ্ছে বালু। উত্তোলিত বালু দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে স্থানান্তর করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আশপাশের কৃষিজমি ও পাড়ে।

​এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে থাকা মূল অভিযুক্তরা হলেন,​কাগজিখোলা এলাকার মৃত মোজাম্মেল হকের ছেলে মুবিনুল হক ও আজিজুল হক,১নং ওয়ার্ডের আবুল বশরের ছেলে রিয়াদ ​এ ছাড়া স্থানীয় আরও কয়েকটি ক্ষমতাধর গোষ্ঠী পিছন থেকে এদের ইন্ধন যোগাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ও ফকিরাখোলা সহ অংসাঝিরি থেকে ইজারা ছাড়াই অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এরা হলেন ইসমাইল, শাহজাহান, মুমিন, রাসেল, আবু, আরমান, হুমায়ুন, শুক্কুর, ধলা মিয়া, সাইফুল মিস্ত্রী সিন্ডিকেট।

​ধ্বংসের মুখে জনপদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো ​অনিয়ন্ত্রিত ও ড্রেজার মেশিন দিয়ে ছড়ার তলদেশ থেকে অতিমাত্রায় বালু তোলার ফলে ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হচ্ছে ​নদীভাঙন ও ছড়ার তলদেশ অতিরিক্ত গভীর হয়ে যাওয়ায় এবং দুই পাড়ের মাটি অলক্ষিতভাবে ধসে পড়ায় ছড়াতীরবর্তী কৃষিজমি ও বসতবাড়ি চরম ধসের ঝুঁকিতে পড়েছে।

​লাইল্যারমার পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা হওয়ায় মেশিনের বিকট শব্দে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ​নদীর পানির সাথে বালি ও কাদা আশপাশের ফসলি জমিতে জমা হয়ে উর্বর মাটি নষ্ট করছে। এতে স্থানীয় কৃষকরা চাষাবাদ করতে না পেরে অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

​বালু বহনের জন্য ব্যবহৃত ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে নির্মানাধীন রাস্তা , গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও ব্রিজগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে ভেঙে পড়ছে।

অন্যদিকে,লামা উপজেলা প্রশাসন অবৈধভাবে উত্তোলিত এসব বালু জব্দ দেখিয়ে পরবর্তীতে লোক দেখানো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করছে। এর ফলে বালুখেকোরা সামান্য জরিমানা বা নিলামের মূল্য পরিশোধ করে কোটি টাকার অবৈধ বালু উত্তোলনের স্থায়ী বৈধ্যতা পেয়ে যাচ্ছে।

​আইনের তোয়াক্কা না করে দিনদুপুরে পরিবেশ ধ্বংসের এই মহোৎসব চললেও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের আকুতি শোনার কেউ নেই। নিরুপায় হয়ে বাইশারী ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ এবং সচেতন মহল দ্রুত এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।অভিযোগ রয়েছে, কেবল বাইশারী বা লাইল্যারমার পাড়াই নয় পুরো লামা উপজেলাজুড়ে প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ বালু পয়েন্ট সক্রিয় রয়েছে।​

​তারা অনতিবিলম্বে খুটাখালী ছড়াসহ আশপাশের সকল পয়েন্টে যৌথ অভিযান পরিচালনা, ড্রেজার ও সেলো মেশিন জব্দ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বালুমহাল আইন অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য বান্দরবান জেলা প্রশাসক, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

জানতে চাইলে বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুল হাসান সজীবের 01715-427656 মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে এই প্রতিবেদকের ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।