​৩৫ হাজার টাকায় রফা, নবজাতককে এতিম করে মা উধাও—ক্লিনিকের সামনে স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ ও ধুন্ধুমার পরিস্থিতি

​মোঃ মফিজুল ইসলাম লালমনিরহাট | ২ নভেম্বর ২০২৬

​একটি ফুটফুটে নতুন প্রাণের পৃথিবীর আলো দেখার আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো পৈশাচিক কান্নায়! মায়ের কোলে আদুরে শিশুকে জড়িয়ে ধরার সুখের স্বপ্ন নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। লালমনিরহাটের সাপটানা বাজার এলাকার কুখ্যাত ‘নিউ অতিথি ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক নার্সিং হোম’-এ এক প্রসূতির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো জেলায় এখন চরম তোলপাড় চলছে। প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসা ও চরম অবহেলা, নাকি টাকার বিনিময়ে জীবন নিয়ে এক নিষ্ঠুর বাণিজ্য?

​যেভাবে ফাঁদে পড়েছিল হতভাগ্য পরিবার

​নিহত প্রসূতির বাড়ি জেলার মহিষখোঁচা এলাকায়। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রসব বেদনা উঠলে প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে কোনো অলৌকিক বা রহস্যজনক ইশারায় রাত ৪টার দিকে তাকে ছাড়পত্র ধরিয়ে দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

​ঠিক সেই মুহূর্তে ওত পেতে থাকা এক দালালের খপ্পরে পড়ে পরিবার। ক্লিনিক কর্মীদের মিষ্টি কথায় গলে গিয়ে তারা রোগীকে নিয়ে যান এই ‘নিউ অতিথি ক্লিনিকে’। অভিযোগ রয়েছে, যমুনা ক্লিনিক ও অতিথি ক্লিনিকের একদল অসাধু চক্রের যোগসাজশেই রোগী টানার এই রমরমা বাণিজ্য চলছে।

​৩৫ হাজার টাকার চুক্তি আর এক অপারেশন!

​নিহতের ভাসুরের বিস্ফোরক দাবি অনুযায়ী, মাত্র ৩৫ হাজার টাকার একটি প্যাকেজ চুক্তিতে রফা হয় সিজারের। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১টা ৫৩ মিনিট—অপারেশন থিয়েটার থেকে জানানো হয়, জন্ম নিয়েছে এক ফুটফুটে পুত্রসন্তান। নবজাতকের কান্নার শব্দে তখন স্বজনদের চোখে আনন্দের জল। কিন্তু কে জানত, এই আনন্দের আড়ালেই ঘনীভূত হচ্ছে এক গভীর অন্ধকার!

​রাত বাড়তেই ভয়ের নাটক, রক্তচাপ নামল ৮০/৬০-এ!

​দিনের আলো ফুরোতেই পাল্টাতে শুরু করে পরিস্থিতি। রাত ৯টার পর থেকেই প্রসূতির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকে। অথচ ক্লিনিকের ভেতরে তখন চিকিৎসকদের লুকোচুরি খেলা।

​স্বজনদের অভিযোগ, গভীর রাত ২টার দিকে তাদের জানানো হয় রোগীর অবস্থা ভালো নয়। সকালে যখন থমথমে পরিবেশে রোগীর রক্তচাপ মেপে দেখা যায় মাত্র ৮০/৬০, ততক্ষণে প্রসূতির নিথর দেহটি মৃত্যুর কুয়াশায় তলিয়ে গেছে! রোগীর নিস্তেজ শরীর দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের লোকজন।

​মরা মানুষকেও বাঁচানোর ভুয়া নাটক!

​সবচেয়ে ভয়ংকর ও সন্দেহজনক তথ্য মিলল এরপরেই। রোগীর মৃত্যুর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে বলে, “রোগীকে দ্রুত রংপুরে নিয়ে যান!”

স্বজনদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধলে তারা কড়া প্রতিবাদ জানান। আর প্রতিবাদ করতেই মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যায় ক্লিনিকের মালিক পক্ষ ও সমস্ত স্টাফ! তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ক্লিনিক চত্বরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে রণক্ষেত্রের পরিবেশ তৈরি হয়।

​অপারেশন টেবিলে কে ছিলেন সেই ডাক্তার?

​পরিবার সূত্রে জানা গেছে, এই লোমহর্ষক অপারেশনটি করেছিলেন বাইরে থেকে আসা ডা. সাহেব আলী নামের এক চিকিৎসক—যিনি রংপুর থেকে এসে এই ক্লিনিকে অপারেশন করতেন বলে জানা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই চিকিৎসকের প্রকৃত যোগ্যতা ও বৈধ বিএমডিসি (BMDC) নিবন্ধন ছিল কি না, অপারেশন চলাকালীন রোগীর অবস্থা কেন হঠাৎ বিগড়ে গেল, এবং মৃত্যুর পর কেন তাৎক্ষণিকভাবে সঠিক লাইফ সাপোর্ট বা ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—তার কোনো সদুত্তর নেই।

​নবজাতক বেঁচে আছে, মা হারা শিশুটির কান্না কাকে দেখাবে?

​মায়ের উষ্ণ স্পর্শ পাওয়ার আগেই এই পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি এক নবজাতক পুত্রশিশু। সে সুস্থ থাকলেও তার মা আজ চিরতরে হারিয়ে গেছেন না ফেরার দেশে। ক্লিনিকের সামনে এখন কেবলই স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর আহাজারি। এলাকাবাসীর একটানা প্রশ্ন—এই অবৈধ ক্লিনিকগুলোর লাইসেন্স দেয় কারা? এর আগেও এই চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও রহস্যজনক কারণে সবই ধামাচাপা পড়ে গেছে।

​প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কাম্য

​হতভাগ্য পরিবার ও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর দাবি—অবিলম্বে ক্লিনিকের সমস্ত চিকিৎসা নথি জব্দ করতে হবে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে হবে এবং অভিযুক্ত চিকিৎসক ও ক্লিনিক মালিকদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

​একটি নবজাতকের কান্নার আওয়াজ কি এবার ঘুম ভাঙাবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের? নাকি আবারও ধামাচাপা পড়বে আরও একটি তাজা প্রাণের মৃত্যু? এ নিয়ে পুরো লালমনিরহাটজুড়ে এখন চলছে তীব্র উত্তেজনা।

​(প্রতিবেদনটি আপডেট করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ এবং সিভিল সার্জনের বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।)