মো: শিহাব উদ্দিন শেখ (বিশেষ প্রতিনিধি)
ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রদত্ত সরকারি বরাদ্দের চাল বিতরণে চরম অনিয়ম ও স্বাক্ষর জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন পূজা মণ্ডপ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর জাল করে সরকারি চাল উত্তোলন ও আত্মসাতের এই অভিযোগ উঠেছে সাভার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে এবং সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য সাংবাদিকদের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছেন উক্ত কার্যালয়ের অন্য কর্মকর্তা। পরবর্তীতে জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করে সাংবাদিকদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন অভিযুক্ত ওই খাদ্য কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জালিয়াতির শিকার হওয়া মণ্ডপগুলোর মধ্যে রয়েছে, আশুলিয়ার বাইপাইল বসুন্ধরা গুরুদয়াল দুর্গামন্দির, শিমুলিয়া নৈহাটি সরকারবাড়ি দুর্গামন্দির, জামগড়া বেড়ন মহামায়া সার্বজনীন দুর্গামন্দির এবং নরসিংহপুর সার্বজনীন দুর্গামন্দির।
গুরুদয়াল দুর্গামন্দিরের সাধারণ সম্পাদক সম্ভু চন্দ্র সরকার এবং জামগড়া বেড়ন মহামায়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের সভাপতি প্রদীপ কুমার জানান, পূজা চলাকালে মণ্ডপের নানা ব্যস্ততার কারণে তাঁরা চাল উত্তোলন করতে পারেননি। তৎকালীন সময়ে খাদ্য কার্যালয় থেকে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, পূজা শেষে সশরীরে উপস্থিত হয়ে নথিপত্রে স্বাক্ষর করে চাল গ্রহণ করবেন
তবে পূজা শেষ হওয়ার পর চালের জন্য খাদ্য কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তাঁদের জানানো হয়, চাল উত্তোলন সম্পন্ন হয়ে গেছে এবং নতুন করে স্বাক্ষরের প্রয়োজন নেই। পরবর্তীতে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের অজান্তে অসাধু উপায়ে স্বাক্ষর জালিয়াতি করে বরাদ্দের চাল উত্তোলন ও খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দ অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সাভার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের মুখোমুখি হলে তিনি প্রথমে নানাবিধ অজুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। তবে জালিয়াতির পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে একপর্যায়ে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার অঙ্গীকার করেন। এর আগে, ঘটনাটি চেপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একই কার্যালয়ের একজন সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন।স্বাক্ষর জালিয়াতির নথিপত্র এবং সংবাদ বন্ধে অর্থ প্রদানের চেষ্টা ও হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ার দৃশ্য সংবলিত ভিডিও ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হেফাজতে রয়েছে।
সরকারি বরাদ্দের চাল উত্তোলনে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতি কেবল প্রশাসনিক অনিয়মই নয়, এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত সাভার উপজেলা প্রশাসন ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে নথিপত্র যাচাই করা উচিত। একই সাথে চালের সঠিক হিসাব প্রকাশ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও পূজা মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এমনকি পরবর্তীতে তাঁর কার্যালয়ে সশরীরে গিয়েও তাঁর সাক্ষাৎ মেলেনি।