‎মো: শিহাব উদ্দিন শেখ, বিশেষ প্রতিনিধি।।

‎

‎ঢাকার সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং চাকরির নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ চতুর্থ দিনে এসে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে রূপ নিয়েছে।

‎

‎মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের নিশ্চিন্তপুর, নরসিংহপুর ও ইউনিকসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে।

‎

‎শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে এবং অন্তত ১৩ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

‎

‎আশুলিয়ার শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের মজুরি অসন্তোষ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চাকরির অনিশ্চয়তা ও শ্রমিক অধিকারসংক্রান্ত নানা অভিযোগ। তবে এবারের আন্দোলন নতুন মাত্রা পায় অক্টোবরের শেষ দিন ও নভেম্বরের শুরুতে।

‎

‎১ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার নিউ এজ গ্রুপের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের প্রধান দাবি ছিল, বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও সামনে আসে।

‎

‎প্রথম দিনেই সাভার ও আশুলিয়ার ১৭৭টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে নরসিংহপুর, জিরাবো, কাঠগড়া, নিশ্চিন্তপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করে সড়কে বিক্ষোভে অংশ নেন।

‎

‎২ নভেম্বর আন্দোলনের ব্যাপকতা আরও বাড়ে। সাভার-আশুলিয়ার ২৬৪টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। একই সময়ে গাজীপুরসহ দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

‎

‎শ্রমিকদের বক্তব্য, বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি দিয়ে বর্তমান বাজারদরে সংসার চালানো কঠিন। চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অধিকাংশ শ্রমিককে আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে। তাদের দাবি, শুধু বেঁচে থাকার মতো মজুরি নয়, সম্মানজনক জীবনযাপনের উপযোগী বেতন নিশ্চিত করতে হবে।

‎

‎এখানে উল্লেখযোগ্য, ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পর ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। শ্রমিকদের দাবি, এরপর জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে নতুন করে মজুরি কাঠামো নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

‎

‎মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভের একটি বিষয় হলো কথিত কালো তালিকাভুক্তি। শ্রমিকদের অভিযোগ, কোনো কারখানায় শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বলা, আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিংবা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর কারণে অনেক শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন। পরবর্তী সময়ে অন্য কারখানায় চাকরি পেতেও বাধার সম্মুখীন হন বলে তাদের অভিযোগ। এ ছাড়া শ্রমিকদের একটি অংশের অভিযোগ, বিভিন্ন কারখানায় বিনা নোটিশে ছাঁটাই, বকেয়া বেতন, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। বে এসব অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীনভাবে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি।

‎

‎মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের জমায়েত ও বিক্ষোভ শুরু হয়। কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর শ্রমিকরা সড়কে নেমে আসেন। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শ্রমিকদের একটি অংশ পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বলে পুলিশের অভিযোগ। বিভিন্ন স্থানে কারখানা ও যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

‎

‎আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, সংঘর্ষে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সোমবারই প্রায় ২০ জন আহত হন। মঙ্গলবারও এক পুলিশ সদস্যের মাথায় ইটের আঘাত লাগে। পরে তার মাথায় চারটি সেলাই দিতে হয়েছে।

‎

‎পুলিশ সুপারের দাবি, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে পুলিশ সহযোগিতা করছে। কিন্তু কিছু লোকের ইন্ধনে শ্রমিকদের একটি অংশকে ব্যবহার করে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশ আত্মরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে। শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আশুলিয়া থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া সাভার মডেল থানায় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

‎

‎সাভার থানার সুত্র অনুযায়ী, সাভার মডেল থানা থেকে ৯ জন এবং আশুলিয়া থানা থেকে চারজনসহ মোট ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তদন্তের ফল এখনো আদালতে প্রমাণিত নয়।

‎

‎আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোস্তাফিজুর রহমান ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের বক্তব্য, শ্রমিকদের মজুরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করার পরও একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে কারা এই তৃতীয় পক্ষ, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং তাদের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কী, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

‎

‎মঙ্গলবার দুপুরে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার জানান, তার আওতাধীন প্রায় ৮০০ কারখানার মধ্যে শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুর ও জিরাবো এলাকার কিছু কারখানায় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে সাভারের অন্যান্য এলাকার অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন চলছিল।

‎তিনি আরও জানান, কয়েকজন কারখানা মালিক উৎপাদন চালু করতে পুলিশের নিরাপত্তা চেয়েছেন। পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

‎

‎শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবির মুখে ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। বোর্ডে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি। শ্রমিকদের একটি অংশের প্রশ্ন, বোর্ডে তাদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত হবে, নতুন মজুরি কত নির্ধারণ করা হবে এবং সেটি কবে থেকে কার্যকর হবে?

‎

‎বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ও মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর শ্রমিক নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ ও অধিকার নিয়ে ব্যাপক সংস্কারের দাবি ওঠে। ২০১৬ সালে আশুলিয়ায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হয়। ২০১৮ সালে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ দেখা দেয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও শ্রমিকদের একটি অংশ তা পর্যাপ্ত মনে করেনি। ২০২৬ সালে এসে সেই অসন্তোষ নতুন করে বিস্ফোরিত হয়েছে।

‎

‎বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মজুরি নির্ধারণ করলেই শ্রমিক অসন্তোষের স্থায়ী সমাধান হবে না। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, চাকরির নিশ্চয়তা, শ্রমিক সংগঠনের কার্যকর ভূমিকা এবং মালিক-শ্রমিকের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।

‎

‎আশুলিয়ার শ্রমিক আন্দোলন এখন সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, অন্যদিকে পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা জরুরি।

‎

‎এ পরিস্থিতিতে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে: শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য? শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি? আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে চাকরি হারানো শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে কীভাবে? পুলিশের বলপ্রয়োগ ও সংঘর্ষে আহত শ্রমিকদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি? আন্দোলনের পেছনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনের অভিযোগের সত্যতা কী? ভবিষ্যতে এমন শ্রমিক অসন্তোষ ঠেকাতে সরকার ও মালিকপক্ষ কী স্থায়ী ব্যবস্থা নেবে?

‎

‎সব মিলিয়ে আশুলিয়ার শ্রমিক আন্দোলন শুধু ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রমিকের মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ। এখন দেখার বিষয়, আলোচনা ও কার্যকর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই অস্থিরতার অবসান কত দ্রুত ঘটে।